স্কুল-কলেজের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা স্বচ্ছ করতে সরকারের করণীয় কী?
রাসেল ইব্রাহীম
আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজ পর্যায়ে সরকারি নিয়ম অনুসারে বছরে দুটি প্রধান পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়—অর্ধ-বার্ষিক এবং বার্ষিক পরীক্ষা। কিন্তু এই পরীক্ষাগুলো কতটুকু স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় হচ্ছে, তা তদারকি করার সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা নেই। দেশের শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে এই অভ্যন্তরীণ পরীক্ষাগুলোর মান এসএসসি বা বোর্ড পরীক্ষার সমপর্যায়ের হওয়া জরুরি। এর ফলে শিক্ষার্থীরা মূল পাবলিক পরীক্ষায় বসার আগেই মানসিকভাবে পরিপক্ব ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে।
বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিজ ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করেন। এতে একশ্রেণীর শিক্ষকের মনে এই চিন্তা কাজ করে যে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী তার কাছে প্রাইভেট বা কোচিং পড়ে কি না! অভিযোগ রয়েছে, প্রাইভেট পড়লে ভুল উত্তর বা দুর্বল লেখাতেও অকাতরে নম্বর দেওয়া হয়। অনেক সময় পরীক্ষার আগেই শিক্ষার্থীদের হুবহু ৩০টি বহুনির্বাচনী (MCQ) কিংবা নির্দিষ্ট কিছু সৃজনশীল প্রশ্ন জানিয়ে দেওয়া হয়। ফলে একজন শিক্ষার্থী সারা বছরে সর্বসাকুল্যে মাত্র ১০০টি এমসিকিউ এবং ১৫-২০টি সৃজনশীল প্রশ্ন পড়েই শতভাগ নম্বর পেয়ে যাচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ার কারণে অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের কাছ থেকে 'গোল্ডেন জিপিএ-৫' প্রত্যাশা করা শুরু করেন। কিন্তু যখন এই শিক্ষার্থীরাই মূল ফাইনাল বা বোর্ড পরীক্ষায় গিয়ে আশানুরূপ ফল পায় না বা ফেল করে, তখন পরিবার ও শিক্ষার্থীর মধ্যে চরম হতাশা নেমে আসে। অন্যদিকে, যারা নিজের মেধার জোরে ভালো পড়াশোনা করে, তারা অনৈতিক এই প্রতিযোগিতায় তুলনামূলক কম নম্বর পেয়ে মানসিক মনোবল হারিয়ে ফেলে। এই একই সংকট কলেজ পর্যায়েও বিদ্যমান।
শিক্ষা ব্যবস্থার এই ত্রুটি দূর করতে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া অত্যন্ত জরুরি:
১. প্রশ্নপত্র প্রণয়ন: জেলা কিংবা উপজেলা শিক্ষা অফিসকে সিলেবাস অনুসারে প্রশ্ন প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। পরীক্ষার ঠিক আগে ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রশ্ন সরবরাহ করলে প্রশ্ন ফাঁসের বা নির্দিষ্ট সাজেশন দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
২. খাতা মূল্যায়ন: এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের দিয়ে মূল্যায়ন করাতে হবে। উত্তরপত্রে শিক্ষার্থীর নাম-রোল গোপন রেখে কোড পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে শিক্ষকরা নিরপেক্ষভাবে সঠিক নম্বর দিতে বাধ্য হবেন এবং শিক্ষার্থীরা নিজের আসল মেধা সম্পর্কে জানতে পারবে।
৩. কোচিং বাণিজ্য বন্ধ: এই নিয়ম চালু হলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে ওঠা অনৈতিক প্রাইভেট-কোচিংয়ের ব্যবসা এক ধাক্কায় বন্ধ হয়ে যাবে।
এই যুগান্তকারী পদক্ষেপটি বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত কোনো আর্থিক খরচের প্রয়োজন হবে না। উল্টো প্রশাসনিক তদারকি বৃদ্ধির মাধ্যমে অনেক যোগ্য শিক্ষক তাদের খাতা দেখার ন্যায্য পাওনা বুঝে পাবেন। নতুন শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার এই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
লেখক:শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ